রাতের নিস্তব্ধতায় যখন শহরটা নিভে যায়, তখনও জেগে থাকে তুষি। তার হাতে থাকে এক মুঠো খাতা, সামনে বসে ছোট্ট দুই-তিনজন ছাত্র। ক্লাস শেষে যখন হাতে গোনা টাকাগুলো গুনে দেখে, তখন তার চোখে ভেসে ওঠে সংসারের হিসাব, ভাইয়ের স্কুল ফি, বোনের খাতা, মায়ের ওষুধ।
বাবা বহু আগেই হাত গুটিয়ে নিয়েছে দায়িত্ব থেকে। তাই মাত্র বাইশ বছরের তুষি সংসারের হাল ধরেছে। এই বয়সে বাস্তবতার সাথে টিকে থেকে মেয়ে হয়ে হাল ধরাটা বোধহয় আরো কঠিন ব্যাপার। দিনের বেলা বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকচার, রাতে টিউশন, এটাই তার জীবনচক্র। তবুও কষ্টকে সে কখনো হার মানতে দেয়নি। সে বিশ্বাস করতো, অন্ধকার যত গভীর হয়, আলো তত কাছেই থাকে।
একদিন হঠাৎ খবর এলো, দেশের একটি নামী গবেষণা প্রতিষ্ঠানে “Young Research Fellowship” এর সুযোগ মিলেছে। শর্ত কঠিন, কিন্তু যারা সমাজের জন্য কাজ করতে চায়, তাদের জন্য দ্বার খুলে দেওয়া হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষক এর সহযোগিতায় সে আবেদন করলো, দিন-রাত পরিশ্রম করে একটি গবেষণা প্রস্তাব লিখল, গ্রামের দরিদ্র শিশুদের শিক্ষার সুযোগ নিয়ে।
ফলাফল প্রকাশের দিন, ফোনে ভেসে এলো সংবাদ:
“Congratulations, you have been selected!”
মুহূর্তেই চোখ ভিজে গেল তুষির। বুকের ভেতর আনন্দের ঝড়। এতো বছরের ঘাম, রাতজাগা, অপমান- সব যেন এই একটি শব্দে মিলিয়ে গেল।
কিন্তু এখানেই শেষ নয়, এখান থেকেই শুরু হলো তার নতুন জীবন। আগে প্রতিদিনের সংগ্রাম মানেই ছিলো, ঘরের চিন্তা, ভাই-বোনের স্কুলফি, আর মায়ের ক্লান্ত মুখ। এখন সেই দিনগুলো ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে। সুযোগ পাওয়ার পর তুষিরর কাঁধ থেকে নেমে গেছে অর্ধেক বোঝা। তার পরিশ্রমের স্বীকৃতি তাকে শুধু আর্থিক স্বস্তিই দেয়নি, দিয়েছে নতুন এক সম্মান, নতুন এক আস্থা।
যে মেয়েটাকে একসময় অনেকে অবহেলা করতো, আজ তার গল্প অন্যদের অনুপ্রেরণা। আগে যে রাতগুলোর অধিকাংশ অতিবাহিত হতোভ টিউশনিতে, আজ সেই রাতগুলোয় সে নিজের স্বপ্নকে বড় করার জন্য পড়াশোনা করছে। মায়ের চোখে ভেসে ওঠে তৃপ্তির হাসি, ভাই-বোনের চোখে ফিরে এসেছে স্বপ্ন দেখার সাহস।
ঝড় থেমে গেলে যেমন আকাশে তারা জ্বলে,
তেমনি তার জীবনের অন্ধকার ভেদ করে আলো ফুটলো যেনো। এই সাফল্য শুধু তার ব্যক্তিগত জয় নয়, এটা এক পরিবারের নতুন ভোর। সত্যিকারের সাফল্য কেবল একটি পদবী নয়, এটি সেই আলো, যা নিজের সঙ্গে সবার অন্ধকারও ভেদ করে দেয়।
লেখক:
সিদরাতুল মুনতাহা তাবিতা
MT of Content Writing Department